
কোন নামাজ কত রাকাত: পাঁচ ওয়াক্ত ও বিশেষ নামাজের বিস্তারিত গাইড
ইসলামে নামাজ মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি দিনে পাঁচবার আদায় করা ফরজ এবং এর মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেন। প্রতিটি নামাজের নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা রয়েছে, যা ফরজ, সুন্নত, নফল এবং ওয়াজিব হিসেবে বিভক্ত। এছাড়া বিশেষ নামাজ যেমন জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ, তাহাজ্জুদ, তারাবীহ ইত্যাদিরও নিজস্ব নিয়ম ও রাকাত রয়েছে। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো কোন নামাজ কত রাকাত এবং এর পেছনের তাৎপর্য।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তাদের রাকাত
ইসলামে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হলো ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব এবং এশা। প্রতিটি নামাজের রাকাত সংখ্যা নিম্নরূপ:
১. ফজর নামাজ:
ফজর নামাজ মোট ৪ রাকাত। এর মধ্যে ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত পড়তেন) এবং ২ রাকাত ফরজ। ফজরের সুন্নত নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি ফরজের আগে পড়তে হয়। এই নামাজ ভোরে সূর্যোদয়ের আগে আদায় করা হয়।
২. জোহর নামাজ:
জোহর নামাজ মোট ১২ রাকাত। এর মধ্যে ৪ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (ফরজের আগে), ৪ রাকাত ফরজ, ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (ফরজের পরে) এবং ২ রাকাত নফল। জোহর দুপুরে সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে আসরের সময় শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত পড়া হয়।
৩. আসর নামাজ:
আসর নামাজ মোট ৮ রাকাত। এর মধ্যে ৪ রাকাত সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা (ঐচ্ছিক সুন্নত) এবং ৪ রাকাত ফরজ। তবে সাধারণত মুসলিমরা আসরে শুধু ৪ রাকাত ফরজই পড়েন, কারণ সুন্নতটি বাধ্যতামূলক নয়। এই নামাজ বিকেলে আদায় করা হয়।
৪. মাগরিব নামাজ:
মাগরিব নামাজ মোট ৭ রাকাত। এর মধ্যে ৩ রাকাত ফরজ, ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং ২ রাকাত নফল। মাগরিব সূর্যাস্তের পরপরই পড়তে হয় এবং এটি একমাত্র ফরজ নামাজ যার রাকাত সংখ্যা ৩।
৫. এশা নামাজ:
এশা নামাজ মোট ১৭ রাকাত। এর মধ্যে ৪ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (ফরজের আগে), ৪ রাকাত ফরজ, ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (ফরজের পরে), ৩ রাকাত বিতর (ওয়াজিব) এবং ৪ রাকাত নফল। এশা রাতে ইশরাকের সময় থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত পড়া যায়। বিতর নামাজ এশার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটি ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হয়।
বিশেষ নামাজ ও তাদের রাকাত
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও কিছু বিশেষ নামাজ রয়েছে, যেগুলোর রাকাত সংখ্যা ও নিয়ম ভিন্ন।
১. জুমার নামাজ:
জুমার নামাজ শুক্রবারে জোহরের সময় আদায় করা হয়। এটি মোট ১৪ রাকাত। এর মধ্যে ৪ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (খুতবার আগে), ২ রাকাত ফরজ (জামাতের সঙ্গে), ৪ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা (ফরজের পরে), ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং ২ রাকাত নফল। জুমার ফরজ নামাজ জামাতে পড়তে হয় এবং এর আগে খুতবা শোনা জরুরি।
২. ঈদের নামাজ:
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজ ২ রাকাত করে। এটি ফরজ নয়, বরং ওয়াজিব। এই নামাজে কোনো আজান বা ইকামত নেই এবং ২ রাকাতের মধ্যে অতিরিক্ত তাকবির দেওয়া হয়।
৩. তাহাজ্জুদ নামাজ:
তাহাজ্জুদ রাতের নফল নামাজ, যা ২ থেকে ১২ রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়। সাধারণত ৮ রাকাত পড়া হয়। এটি রাতের শেষ প্রহরে আদায় করা উত্তম।
৪. তারাবীহ নামাজ:
রমজান মাসে এশার পর তারাবীহ নামাজ পড়া হয়। এটি ২০ রাকাত (কিছু মতানুসারে ৮ রাকাত), যা ২ রাকাত করে পড়া হয়। এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
৫. জানাজার নামাজ:
জানাজার নামাজ ৪ তাকবিরের মাধ্যমে আদায় করা হয় এবং এতে কোনো রাকাত নেই। এটি দাঁড়িয়ে পড়তে হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা হয়।
নামাজের রাকাতের গুরুত্ব
নামাজের রাকাত সংখ্যা শরিয়ত দ্বারা নির্ধারিত। ফরজ রাকাতগুলো বাধ্যতামূলক, যেগুলো ছাড়া নামাজ পূর্ণ হয় না। সুন্নত ও নফল রাকাতগুলো ফরজের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে এবং এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নামাজ হলো দ্বীনের স্তম্ভ।” তাই প্রতিটি রাকাত সঠিকভাবে আদায় করা জরুরি।
নামাজ মুসলিম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফজর থেকে এশা পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং বিশেষ নামাজগুলোর রাকাত সংখ্যা জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফরজ, সুন্নত, নফল ও ওয়াজিব রাকাতের সমন্বয়ে নামাজ আমাদের জীবনে শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিক শান্তি এনে দেয়। তাই আমাদের উচিত নিয়মিত নামাজ আদায় করা এবং এর রাকাত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা।